সংবাদ/বিবৃতি

The superiority of Muslims remain in” establishing truth and resisting against injustice”. It is a holy duty for a Muslim to do this work with his/her level best . Especially, students are perfect soldiers for this work. That is why, students are active and effective manpower of a country and a nation.

কাতার সঙ্কট ও পরাক্রমের কূটনীতি –ড. আবদুল লতিফ মাসুম

masum sir 2

পররাষ্ট্রনীতির নিয়ামক হচ্ছে কূটনীতি। নীতিগতভাবে কূটকৌশলের কোন অনুমোদন না থাকলেও ব্যবহারিকভাবে এর প্রয়োগ প্রায় সর্বত্রই প্রতিফলিত হয়। একরকম আকস্মিকভাবেই কাতার কূটনৈতিক বিপাকে পড়েছে। কাতারের স্বকীয়তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সার্বিক ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। ক্ষমতার স্বার্থ এবং চাতুর্যে আঞ্চলিক শক্তির বৈরিতার শিকার হয়েছে দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কাতার নাগরিক স্বাধীনতা এবং অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থার জন্য স্বকীয়তার দাবীদার। কাতারের শাসকগোষ্ঠী রাজতান্ত্রিক ধারায় প্রতিষ্ঠিত। সে ক্ষেত্রে সৌদিআরব, আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো বাদশাহ, আমীর-ওমরাহ্দের সাথে কাতারের সখ্যতা থাকা স্বাভাবিক এবং তা রয়েছেও। কাতার উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-জিসিসি এর সদস্য। মার্কিন তাবেদারির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে নেই। কাতারের মাটিতে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। ইসরাঈলের সাথে রয়েছে তাদের সহযোগিতা। তাহলে গোল বাঁধলো কোথায়?

পটভূমি
দৃশ্যত ঘটনার শুরু কাতারি আমীর তামিম বিন হামাদ বিন আল-থানি কথিত একটি বিবৃতি। এই বিবৃতিতে আমীর যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেন এবং ইরানকে সহায়তার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সমর্থন পুনঃব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি ইসরাঈলের সঙ্গে কাতারের ‘সুসম্পর্ক আছে’ বলেও উল্লেখ করেন। কাতারের তরফ থেকে দৃঢ়তার সাথে বলা হয়- কথিত বিবৃতিটি একটি প্রতারণার ফসল। এটি একটি সাইবার হামলাও বটে। কাতারের তদন্তকারীদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, কাতার নিউজ এজেন্সির ওয়েবসাইটের একটি ইলেক্ট্রনিক গ্যাপকে কাজে লাগিয়ে একটি কারিগরি কৌশলে ওই হামলাটি চালানো হয়। ইতোমধ্যে সিএনএন জানিয়েছে, রাশিয়ার হ্যাকাররা কাতারি বার্তা সংস্থার ওয়েব সাইটের ওই বোগাস খবর ঢোকানোর কাজ করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ধারণা। এই বিবৃতির পর কাতারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদিআরব ও মিশরসহ ৭টি দেশ। তাদের অভিযোগ আইএস, আল-কায়েদাসহ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদীদের মদদ দিচ্ছে কাতার। এতে এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। তবে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে কাতার বলেছে- তাদের বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ ‘অন্যায্য’। ৫জুন সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রথম ঘোষণা দেয় বাহরাইন, এরপর সৌদিআরব। পরে একে একে একই ধরণের ঘোষণা দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, লিবিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপদেশ মালদ্বীপ। দেশগুলো কাতারের সাথে আকাশ, সমুদ্র ও স্থল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের দেশে অবস্থানরত কাতারের নাগরিকদের দেশ ছাড়ার জন্য ৬সপ্তাহ সময় দিয়েছে। কাতার সংযমের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। বিপরীত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কড়া বিবৃতি দানে তারা বিরত রয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরব বিশ্ব সফরের পক্ষকাল পরেই এ ঘোষণাটি আসলো। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ সফরের সময় ‘‘আঞ্চলিক শক্তি’’ সৌদি বৈরি ইরানের বিরুদ্ধে শক্ত বিষোদগার করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক মুসলিমবিরোধী পদক্ষেপের বদলে রক্ষণশীল আরবদেশগুলোর প্রতি তার দৃঢ় সমর্থন এসব দেশকে অতি উৎসাহি করে তোলে। তারই প্রকাশ ঘটে কাতারের বিরুদ্ধে এ সব ব্যবস্থা নিতে। সৌদিআরব তার দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য বরাবরই ইরানকে দোষারোপ করে আসছে। এবার তারা কাতারকে জড়িয়ে অভিযোগ করছে যে, সৌদি পূর্বাঞ্চলীয় কাতিফ অঞ্চল এবং বাহরাইনে সক্রিয় ইরান সমর্থিত সন্ত্রাসীদের ‘ইরান-কাতার’ মদদ দিয়ে যাচ্ছে।

পূর্ব কথা
ঘটনাটি আকস্মিকভাবে মনে হলেও গত কয়েকবছর ধরেই ধীরে ধীরে উত্তেজনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সৌদিআরব, বাহরাইন ও আরব আমিরাত কাতার থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কয়েক মাস দীর্ঘায়িত এ সঙ্কট কাতারের নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। কাতারের দোহায় অবস্থিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা সম্পর্কের অবনতির অন্যতম কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার’ বিরুদ্ধে গণমুখী এ প্রচার মাধ্যমটি শাসককুলের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। সমালোচনার অভিযোগ তুলে দু’সপ্তাহ আগে আল-জাজিরাসহ কাতারের সংবাদ মাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব, মিশর, বাইরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এবারে এসব দেশ আল-জাজিরাকে তাদের মাটি থেকে পাততাড়ি গোটাতে বলেছে। আন্তর্জাতিক বিশে‑ষকরা বলেন, দৃশ্যমান অভিযোগ যাই থাকনা কেন, আসল বিরোধের বিষয় হচ্ছে- সৌদিআরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রাধান্যের দ্বন্দ্ব। কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বেশির ভাগ দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো। এ সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র বলে পরিচিত। কাতারও যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী জোটের অংশীদার। তবে ইরাকের শীয়া নেতারা অভিযোগ করে আসছে যে, সেখানে আইএসকে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে কাতার। এতসব অভিন্ন বিষয় সত্ত্বেও কাতারের নিজস্ব কৌশলের পররাষ্ট্রনীতি তাদের জন্য বিপাকের কারণ হয়েছে। এ রাজনৈতিক বিরোধের ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কটও কাতারকে কাবু করে ফেলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এয়ার লাইন্স ‘ইত্তেহাদ এয়ার ওয়েজ’ ও ‘ফাই দোবাই’ কাতারের রাজধানী দোহা থেকে এবং দোহার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে এমন সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। এদিকে কাতার এয়ারওয়েজ সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে এর সব প্লাইট বাতিল করেছে। কাতারেরর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এই পদক্ষেপ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবীর প্রেক্ষিতে তৈরি। তার দেশকে রাজনৈতিক খবরদারির আওতায় আনার জন্য এমনটি করা হয়েছে’।

মধ্যস্থতা
এসব বিরোধের মাঝখানেও মধ্যস্থতা এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান রয়েছে। কুয়েতের আমীর ভ্রাতৃপ্রতিম দু’দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। তুরস্কের এরদোগান সরকার কাতারের প্রতি তাদের দ্ব্যার্থহীন সমর্থন ঘোষণা করেছে। তুরস্ক কাতারের আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করবার জন্য সেনাবাহিনী প্রেরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উল্লেখ্য যে, তুরস্কের সাথে কাতারের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং সেখানে ইতিপূর্বেই সহস্রাধিক তুর্কি সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। এরদোগান বলেছেন, কাতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এবং দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান হবে না। তুর্কীনেতা বিরোধকে তিনটি শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেন- অগ্রহণযোগ্য, অমানবিক ও ইসলামী মূল্যবোধ বিরোধী। কাতারের সম্পর্ক ছিন্ন করা দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারকে একঘরে করা নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে উপসাগরীয় আরবদেশগুলোকে ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। পরে অবশ্য সুর পাল্টিয়ে ট্রাম্প কাতারের কঠোর সমালোচনা করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কাতারের প্রশংসা করে বলেছে, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাটির জন্য জায়গা দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি তাদের অঙ্গিকার পূরণ করেছে। আল-জাজিরা জানিয়েছে, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদিল আল-জোবায়ের কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য কয়েকটি শর্ত দিয়েছেন। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে- ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সমর্থন বন্ধ করা। উল্লেখ্য যে, হামাস হচ্ছে ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং আরববিশ্বে তারাই প্রথম ব্যালটবাক্সের নির্বাচনে জিতেছে। ১০বছর আগে একযুদ্ধের পর ঐ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা গাজার ক্ষমতা দখল করে নেয়। আর মুসলিম ব্রাদারহুড মিশরের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল হলেও তাদের কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক মুসলিম দেশ তাদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন মনে করে। ব্রাদারহুড ইতোমধ্যেই কাতার সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছে এবং আরব ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, সিরিয়ায় জঙ্গিদের অর্থায়নে কাতার, সৌদিআরব ও কূয়েতের অবদান থাকলেও মার্কিন চাপে সেটা বন্ধ করেছে। কিন্তু কাতার তা করেনি। এর উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তার দেশ ইসলামী কট্টরপন্থীদের সাহায্য করছে এমন কোন প্রমাণ নেই। এদিকে জার্মানী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওই বিরোধে সমদূরত্ব বজায় রাখার চিন্তা করছে। তাদের কাছে কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর রক্ষণশীল আচরণ এবং কাতারের ইসলামী শক্তির প্রতি সমর্থন-কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়।

স্বকীয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাতারের সম্পর্কের উত্তেজনা অনেক দিনের। সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে কোন ঝামেলা নেই। কিন্তু কাতারের মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরা যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের খবর প্রচার করে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্টি আছে। এছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে ইসলামী স্টেটের জঙ্গিদের প্রতি কাতারের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের আরও অভিযোগ, কাতারের সন্ত্রাসবিরোধী আইন খুব কার্যকর নয়। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও মিশরের নিষিদ্ধ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের সমর্থনের বিষয়টি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যাপারে কাতার একরকম খোলামেলা কূটনীতি বা ‘ওপেন ডিপ্লোমেসি’ অনুসরণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামপন্থীদের কাতারের সমর্থন ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’এর সময় থেকেই স্পষ্ট। তারা মিশরের সূচিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের খবর সরাসরি প্রচার করে। আরব বিশ্বের যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, আল-জাজিরা তা প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে কাতারের যুক্তি,তারা ইসলামপন্থী উগ্র সংগঠনগুলোকে সমর্থন করে না। কাতার মনে করে, স্বাভাবিক সংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় থাকবে। অন্যদিকে, নিজেদের ক্ষমতার রজানীতির কারণে সৌদিআরব এবং অন্যান্য আরব দেশগুলো এসব সংগঠনকে শক্তিশালী হতে দিতে নারাজ। তারা মনে করে, গণতন্ত্র তথা উদারনৈতিক রাজনীতি তাদের অস্তিত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর সর্বত্রই স্বৈরাচারী শাসকরা গণমুখী রাজনীতি অনুমোদন করে না। কাতার যাতে এসব বিষয়ে বিরত থাকে সেজন্য ২০১৪ সালে কাতারকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কাতারের অভ্যন্তরীণ পররাষ্ট্রনীতিতে তাদের অনুরোধ প্রতিফলিত হয়নি। হামাদ বিন খলিফা আলথানির আমলে কাতার স্বতন্ত্র কিছু নীতি অবলম্বর করতে শুরু করে। যেমন তারা ইসরাঈল ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সম্পর্ক উন্নয়ন ঘটায়। কাতার আঞ্চলিক সংগঠন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-জিসিসি এর সর্বসম্মত কিছু সিদ্ধান্তে দ্বিমত জানায়। সৌদি আরব ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে রাখে। এ সময়ে তারা কাতারের নানা রকম চাপ দিয়ে তাদের স্বাধীনচেতা আচরণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চালায়। তবে এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে বিবিসির বিশে‑ষণে বলা হয়। বিবিসি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, অতীতে কাতারের ওপর পার্শ্ব দেশগুলোর চাপ অগ্রাহ্য করলেও এখন পরিস্থিতির অবণতি হয়েছে। দৃশ্যত কাতার একরকম একঘরে হয়ে পড়েছে। যদিও তুরস্ক তার পাশে রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ইরান, কুয়েত এবং পাকিস্তান ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। বিসিসি আরও মনে করে, কাতারের স্বকীয়তা পূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অবসান হলে এ অঞ্চলে সৌদিপ্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও ঐ সব দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

দৌড়ঝাপ কূটনীতি
কাতার প্রথম থেকেই সংযম, সহিষ্ণুতা ও দুরদর্শিতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। কাতারের এ অবস্থান গোটাবিশ্বে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। কাতার সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে বলে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মস্কো গেছেন। রাশিয়া এই বিরোধের রাজনৈতিক সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দৃশ্যত মধ্যস্থতার জন্য রিয়াদ গেছেন। সেখানে তিনি সৌদি বাদশার একরকম ধমক খেয়েছেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের সেই স্টাইলের মতো বাদশা তাকে জিজ্ঞেস করেছেন ‘কাতার অথবা সৌদিআরব আপনি কোন পক্ষে?’। নওয়াজ শরীফ বলেছেন- ‘মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগকে সমর্থন করবে ইসলামাবাদ’। পাক প্রধানমন্ত্রীর কাতার সফরের কথা। দৃশ্যত পাকিস্তান সরাসরি মধ্যস্থতা করতে পারছে না। তারা কুয়েতের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন দিয়ে সেটি বেগবান করবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। সেটিও যদি সফল না হয় তখন পাকিস্তান তুরস্কসহ বৃহত্তর বলয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুর নরম হয়ে আসছে। একইসাথে মার্কিন আমলাতন্ত্র ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে নীতিগত ও কূটনৈতিক পরিভাষায় পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন কে কাকে প্রভাবিত করে তাই দেখার বিষয়।

অমানবিক অবরোধ ও খাদ্য সরবরাহ: এ্যামোনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ পৃথিবীর তাবৎ মানবিক সংগঠনগুলো কাতার বিরোধী অবরোধকে ‘অমানবিক ও আন্তর্জাতিক ন্যায়-নীতির লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে’। ওপরদিকে, অবরোধ উদ্ভূত খাদ্যসংকট মোকাবেলা করার জন্য তুরস্ক ও ইরান পর্যাপ্ত খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ করছে। পার্শবর্তী রাষ্ট্র ওমান সৌদি অবরোধে শামিল হয়নি। তারাও নানা ধরণের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার, দারিদ্র প্রপীড়িত সোমালিয়া সৌদি চাপ ও উপঢৌকন অগ্রাহ্য করে কাতারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী নিন্দার মুখে বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোর সংযোগ এবং জরুরি ঔষধ সরবরাহে রাজি হয়েছে। কাতারের সাথে একমাত্র স্থল সংযোগকারী রাষ্ট্রটি সীমান্তএকেরারেই বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন সম্পূর্ণ বন্ধের কথা তারা অস্বীকার করছে।

দ্বন্দ্বের স্বরূপ
মনীষী মার্কস ‘দ্বন্দ্বগত বস্তুবাদ’ এর মাধ্যমে পৃথিবীর তাবৎ ঘটনাবলী ব্যাখ্যা বিশে‑ষণ করেছেন। রাজা- রাজধানীর উত্থান-পতনে এই দ্বন্দ্ব-বিগ্রহ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবীর ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়- ক্ষমতার রাজনীতি কত নির্মম, নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক! ক্ষমতার রাজনীতিতে নিয়মনীতি, নৈতিকতা ও মানবিকতার কোন স্থান নেই। এখানে পিতা পুত্রকে হত্যা করে, পুত্র পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, ভাই ভাইয়ের জীবন কেড়ে নেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিউম বলেন, “Politics is seen to be about might rather than right” শক্তি ক্ষমতার বৈধতার সৃষ্টি করে। কারণ ক্ষমতা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কর্তৃত্ব দেয়। বিশেষত: যেখানে গণতন্ত্রের লেশ মাত্র নেই, সেখানে উত্তরাধিকার অথবা ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্র’ই একমাত্র ক্ষমতা বদলের মাধ্যম। বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রের প্রাবল্যে মধ্যপ্রাচ্যের সামান্তবাদী দেশগুলো একমাত্র ব্যতিক্রম, যেখানে রাজা-বাদশাহ, আমীর-ওমারাহ এবং শাহ-সুলতানরা প্রবল পরাক্রমে আজও ‘শাসন করেন ও রাজত্ব করেন’। এই সব দেশে ক্ষমতার রদবদল এবং প্রথা ভেঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর নতুন কিছু নয়। রাজা-বাদশাদের স্বাভাবিক প্রবণতা উত্তরাধিকারে নিজ নিজ সন্তানের অগ্রাধিকার। যেমন ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে জর্ডানের বাদশা হোসাইন মুমূর্ষু অবস্থায় নিজপুত্র আব্দুল্লাহকে যুবরাজ ঘোষণা করে যান। অথচ ইতিপূর্বে তার ভাই হাসান যুবরাজ হিসেবে ৩৩বছর অতিবাহিত করেন। এইসব ঘটনা ও ব্যাকরণিক পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি রাজতন্ত্রের সাম্প্রতিক পরিবর্তন ব্যাখ্যা-বিশে‑ষণের দাবি রাখে।

আকস্মিক পরিবর্তন
২২ জুন, ২০১৭ বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান তাঁর উত্তরসূরির পদ থেকে নিজের ভাইপো মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে দিয়ে ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে বসিয়েছেন। সৌদি বাদশাহী ফরমানে এ ঘোষণা প্রদান করা হয়। এ ফরমানের মাধ্যমে প্রবল ক্ষমতাশালী বিন নায়েফ ক্ষমতাচ্যুত হলেন। তিনি ভবিষ্যৎ বাদশাহ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে দৃশ্যত বিদায় নিলেন। নতুন যুবরাজ ৩১বছর বয়সী বিন সালমান উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করবেন। আর ৫৭বছর বয়সী বিন নায়েফকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তথা স্বরষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

সৌদি বার্তা সংস্থা
সৌদি প্রেস এজেন্সি- এস.পি.এ জানিয়েছে বিন নায়েফ নতুন যুবরাজকে সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছেন। সৌদি রাজতন্ত্রের ‘লৌহ কঠিন ব্যবস্থা’ থেকে সাবেক যুবরাজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ একরকম অসম্ভব। বিবিসির বিশে‑ষণে বলা হয়, ৮১ বছর বয়স্ক বাদশাহ শারীরিকভাবে অসুস্থ। বিগত দিনগুলোতে তিনি ক্রমশ নিজপুত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছিলেন। উল্লেখ্য যে, সৎভাই আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাদশাহ সালমান সৌদি সিংহাসনে আরোহণ করেন। দেশটিতে সচরাচর ৭০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিরা বাদশাহ হয়ে আসছেন। সে হিসাবে প্রিন্স সালমানের দ্রুত উত্থান একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। অনুসৃত নীতি অনুযায়ী সৌদি রাজতন্ত্রের প্রবীণ ব্যক্তিরা উত্তারাধিকার নির্ণয় করেন। বাদশাহর ছেলেই বাদশাহ হবে- এ নিয়ম সৌদি রাজতন্ত্রে কার্যকর নয়। বরং এতদিন ‘কনসেনসাস’ বা সার্বিক সমঝোতার ভিত্তিতে উত্তরাধিকার বিবেচিত হয়ে আসছিল। বিন সালমানকে একক সিদ্ধান্তে রাজতন্ত্রের উত্তারাধিকারি নির্ধারণ সে ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা।

কে এই বিন সালমান? যুবরাজ বিন সালমানের জন্ম ১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট। তার মা ফাহদাহ বিনতে ফালাহ বিন সুলতান তৎকালিন প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এর তৃতীয় স্ত্রী। রাজধানী রিয়াদের কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তার বাবা যখন রিয়াদের গভর্নর ছিলেন তখন বিন সালমান গভর্নরের বিশেষ পরামর্শক নিযুক্ত হন। ২০১৩ সালে তিনি মন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া হয়। যুবরাজ মনোনীত হওয়ার আগে থেকেই বিন সালমান প্রভাবশালী হিসেবে আবির্ভূত হন। অতি রক্ষণশীল রাজতান্ত্রিক দেশটিতে অর্থনৈতিক ও সামজিক সংস্কার আন্দোলনের নানা উদ্যোগে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ২০১৫ সালে উপ-যুরাজের পদ পাওয়ার পর থেকেই ক্ষমতার আওতা সম্প্রসারণে তিনি যত্নবান ছিলেন। তিনি অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক এবং আগ্রাসী বলে ইতিমধ্যে বিশেষত্ব অর্জন করেছেন। যুবরাজ সালমানই সেই ব্যক্তি যিনি ‘জাজিরাতুল আরব’ বা ‘আরব উপদ্বীপে’ ইরান তথা অন্য যে কোন শক্তির উপস্থিতি অবদমনে অগ্রসর হন। বাদশাহ সালমানের ছেলে বিন সালমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রথম যে কাজটি করে ছিলেন, সেটা ছিল ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনে সামরিক অভিযানের সূচনা। সেখানে ইরানপন্থী হুতি গোষ্ঠী সৌদিপন্থী প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এ অভিযানের মাধ্যমে সৌদি আরবের আগের চেয়ে বেশি আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার আভাস পাওয়া যায়। যুবরাজ সালমান সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূরীকরণে জ্বালানি নীতি পর্যালোচনার পক্ষপাতি বলে বার্তা সংস্থার খবরে জানা গেছে। সার্বিকভাবে তেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাসে তিনি উদ্যোগী। বিকল্প সম্পদ সন্ধানে তিনি মনোযোগী। সৌদি আরবের বিশাল সমুদ্র উপকূলে সাগর সম্পদ আহরণে তিনি বিবিধ পরিকল্পনা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া নানা রকম অর্থনৈতিক সংস্কারে তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল রপ্তানীকারক সংস্থা ‘আরামকো’ ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিতে যুবরাজ পদক্ষেপ নিতে পারেন- এরকম খবর বেরিয়েছে। তিনি যেহেতু পশ্চিমাবিশ্বের অধিকতর আস্থাশীল, সে জন্য তার ইমেজ গড়ার জন্য পশ্চিমা গণমাধ্যম উপর্যুক্ত ইতিবাচক মন্তব্য প্রদান করছেন বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা।

মার্কিন সম্পর্কের অনুঘটক
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ৯/১১ এর বিপর্যয়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক শীতল হয়ে আসে। বারাক ওবামার সময়কালে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তিতে বেজায় ক্ষিপ্ত হয় সৌদি আরব। ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে সবসময়ে শংকিত থেকেছে সৌদি রাজতন্ত্র। ইরান যেহেতু রাজতন্ত্র বিরোধী এবং শিয়া মতালম্বি তাই সৌদিরা ইরানকে তাদের সিংহাসনের প্রতি সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করে। এছাড়া ‘আরব বসন্ত’ তথা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভয়ে সৌদি রাজতন্ত্র ভীত হয়ে আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প চরম ইসলাম বিদ্বেষী হওয়া সত্বেও ওবামার শাসন অবসানের পর শুধুমাত্র ক্ষমতা রক্ষার দায়ে সৌদিরা নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে উন্মুখ হয়ে পড়ে। নতুন যুবরাজ বিন সালমান ছুটে যান ওয়াশিংটনে। গোপন দেন-দরবার করে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন। বিগত মার্চ মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার ‘বিশেষ বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়। কুটনীতিকদের ধারণা, এরই ফলশ্রুতিতে ট্রাম্প সর্বপ্রথম সৌদিআরব সফর করেন। এই সফরের সময়ে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় ‘১০ বিলিয়ন ডলারের’ সমরাস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে ‘ব‑াঙ্ক চেক’ লাভ করে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশে‑ষকগণ মনে করেন, ডোনান্ড ট্রাম্পের সফরের ১৫দিন পরে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা নিরপেক্ষ কাতারের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক অবরোধ ঘোষণা করে তা ট্রাম্পের সফরের ফলশ্রুতি।

কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা
সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল রাজনৈতিক সংকটের সূচনাও সদ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত যুবরাজের হাতে। ইরানকে সমুচিৎ শিক্ষা দেওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরবের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যুবরাজ নিজেই এ উদ্যোগ নেন বলে আন্তর্জাতিক ভাষ্যে বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রগতিশীল সাংবাদিক আবদুস সাত্তার ঘাজালি নিশ্চিত করেন যে, বিন সালমানের অফিস থেকেই অবরোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর উপসাগরীয় মিত্রদের তা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। অবরোধের পরপর আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমঝোতার আহ্বানকে দৃঢ়তার সাথে নাকচ করে দিচ্ছেন এই যুবরাজই। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, কাতারকে ৭২ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের নমনীয় সুর পরিলক্ষিত হলেও ট্রাম্প এবং যুবরাজের কণ্ঠ এখনও ঝাঁঝালো। ইতোপূর্বে তিনি ইরানের সাথে যেকোনো সংলাপ ও সমঝোতার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তারা গোটা ইসলামীবিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং শিয়া মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোলিয়াম বিশেষজ্ঞ ওলিভার জ্যাকব মন্তব্য করেন যে, ‘যুবরাজের নেতৃত্বে সৌদি আরব এক ধরণের কর্তৃত্ববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। তিনি এতটাই অনমনীয় যে, কূটনৈতিক ভাষা অতিক্রমে তিনি দ্বিধাবোধ করেন না।’

মার্কিন শর্তে পরিবর্তন? উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরের সময় সাবেক যুবরাজ বিন নায়েফকে নিস্প্রভ দেখা গেছে। কোন কোন বিশে‑ষক সন্দেহ পোষণ করেন যে, পরিবর্তনটি মার্কিন শর্তানুযায়ী হয়েছে কিনা। ‘মিডল ইস্ট মনিটর’ সাময়িকী বাদশাহ হওয়ার জন্য ‘মার্কিন শর্ত’ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, জার্মানিতে বসবাসরত সৌদি প্রিন্স খালিদ বিন ফারহান আল সৌদ বাবার অবর্তমানে মোহাম্মদ বিন সালমানকে সৌদি বাদশাহ হতে সহায়তা করার জন্য মার্কিন শর্তাবলির কথা প্রকাশ করেছেন। এক টুইটে খালিদ লিখেছেন, সৌদি আরবের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারের একসূত্রে তিনি শর্তসমূহ জানতে পেরেছেন। এসব শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে- ১. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিরঙ্কুশ আনুগত্য করতে হবে এবং তারা যা বলবে তা পালন করতে হবে। ২. গাজার সব ফিলিস্তিনিকে সৌদি আরব ও আমিরাতের অর্থায়নে বিকল্প আবাসস্থল হিসেবে উত্তর সিনাইয়ে পুণর্বাসিত করার পক্ষে কাজ করা। ৩. হামাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করা। ৪. মিসরের কাছ থেকে সানাফি দ্বীপ ফেরত পাওয়া।

ক্ষমতা সুসংহতকরণ
রাজতন্ত্র বা সৌদি ধরণের নিয়ন্ত্রিত সমাজে ঘটনার সত্যতা বা নেপথ্যের খবর জানা খুবই কঠিন। ইতোমধ্যে বিন নায়েফকে গৃহবন্দী করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। যথারীতি সৌদি কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন। সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের খবরও উড়িয়ে দিয়েছেন ঐ কর্মকর্তা। নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম ঐ বন্দিত্বের খবর প্রকাশ করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সাবেক যুবরাজ নায়েফকে লোহিত সাগরীয় নগরী জেদ্দার রাজপ্রাসাদে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাকে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। পর্যবেক্ষক মহল মন্তব্য করছেন, ‘নতুন যুবরাজের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের বিরোধিতা সীমিত রাখতে ঐ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। রাজ পরিবারের মধ্যে যে নিরঙ্কুশ সংহতি নেই- নায়েফের পদচ্যুতি এর বড় প্রমাণ। সৌদি রাজপরিবারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে তার ছিটেফোঁটা সংবাদ ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে’। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ বার্নাড হেইকেল মনে করেন, ‘তাকে (বিন সালমান) যুবরাজ পদে নিয়োগ দিয়ে বাদশাহ সালমান কার্যত মরহুম বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের ছেলেদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার কয়েক দশকব্যাপী ঐতিহ্য থেকে সরে আসার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন’। এতো দিনের প্রচলিত ঐতিহ্যের ব্যতিক্রম এই যে, একটি ঐক্যের আবহাওয়া থেকে একক কর্তৃত্বের রেওয়াজ চালু হলো। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ইতিবাচক দিক হলো- ব্যক্তি যদি ন্যায়বান এবং নাগরিক কল্যাণকামী হয় তা দেশের জন্য শান্তি ও স্বস্তি বয়ে আনে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে বলে ‘বেনেভোলেন্ট ডিকটেটরশীপ’। আর যদি এর বিপরীত হয়, শাসক হয় অন্যায়-অত্যাচারী, নির্মম-নিপীড়নকারী, সহিংস-স্বৈরাচারী এবং দলবাজ-চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজ, তাহলে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। এভাবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাদারীদের সম্পর্কে বলা হয়- ‘Absolute power corrupts, absolutely’। সৌদি জনগণ নেতৃত্বের রদবদলে ইতিবাচক ফলাফল লাভ করুক এটাই প্রত্যাশা।

আয়তনে ছোট কিন্তু গ্যাস সম্পদে খুবই সমৃদ্ধ কাতারের বিরুদ্ধে আরব বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর বিরোধের ফলাফল বিধিনিষেধের পরপরই তীব্রতরভাবে অনুভূত হয়। সার্বিক যোগাযোগ বন্ধের কথা এবং কূটনীতিকদের স্বল্প সময়ে দেশ ত্যাগের অসৌজন্যমূলক আচরণ আন্তর্জাতিক মহলকে বিস্মিত করেছে। কাতারের রাজধানী দোহা বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংযোগ কেন্দ্র। বিধি নিষেধের ফলে দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একরকম বিরাণ হয়ে পড়েছে। কাতার সৌদি খাদ্য সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ। দেশটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য পণ্য সৌদি সীমান্ত দিয়ে পরিবহণ করা হয় যা এখন বন্ধ। আন্তর্জাতিক কূটনীতিক মহল ঘটনার আকস্মিকতা এবং তীব্রতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। যে বিষয়টি কূটনীতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব ছিল তা অযথা বড় ও ব্যাপক করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য তথা আরববিশ্ব এমনিতেই নানা সংঘাত ও সহিংসতায় পরিপূর্ণ। এ অবস্থায় এ ধরণের বিরোধ অনাকাক্সিক্ষত এবং দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক লোক সেখানে কর্মরত রয়েছে। গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে কাতারের সাথে বাংলাদেশের চুক্তিও রয়েছে। অবরোধ পরিবেশে বাংলাদেশ ও কাতার- উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাতার সঙ্কট নিরসণে ভ্রতৃপ্রতীম দেশগুলো যে উদ্যোগ নিয়েছে অবশেষে তা সঙ্কটের সমাধান করবে- এই বিশ্বাস পোষণ করে পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ।

লেখক-
প্রফেসর
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত কার্যক্রম

সম্পর্কিত কার্যক্রম

সদস্য ফরম

নিচে তথ্যগুলো দিয়ে পাঠিয়ে দিন